বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ+ মানুষের লড়াই

যৌন পরিচয়ের ভিন্নতা/যৌন অভিমুখিতা ৯৩% মুসলমানের দেশে একটি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ইসলামে সমলিঙ্গীয় যৌনতা নিষিদ্ধ। শুধু নিষিদ্ধ নয়, প্রচলিত অদৃশ্য ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থার আস্তরণে রীতিমতো এক ধরনের গর্হিত, হত্যাযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

কুরআন ও হাদিসে পূর্ববর্তী ইব্রাহিমীয় ধর্মের মতোই কওমে লুতের সমকামিতা ও পুংমৈথুনের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। সমকামিতা ত্যাগ না করার চূড়ান্ত পরিণতিতে শাস্তি হিসেবে ঐশী বিপর্যয়ের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস হওয়ার কথাও উঠে এসেছে সেসব বর্ণনায়। এছাড়া হাদিসে পুংমৈথুনকারী বা পুংপায়ুকামী ও সমকামী ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার নির্দেশ এসেছে সরাসরি। এমন বাস্তবতায় এলজিবিটিকিউ+ মানুষদের নিজস্ব যৌন পরিচয় ব্যক্তি-নিরাপত্তা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংশয় তৈরি করে।

দ্বীন ইসলাম, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের পুণ্যভূমি বাংলাদেশ। যেখানে ধর্মের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করা হয়। সেখানে মানবাধিকারের প্রশ্ন সংজ্ঞাহীন।

ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষদের আইনগত কাঠামোতেও এত বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয় না। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ঐতিহাসিকভাবে সমলিঙ্গের কিছু ধরনের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।

ভালোবাসা কি অপরাধ?

নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয়, যৌনতার প্রকাশ কী করে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়?

নেপথ্যে কি শুধুই ধর্ম? নাকি ধর্মের অন্তরালে উগ্র ইসলামপন্থীদের ভয়?

লিঙ্গ বৈচিত্র্য কোনো অপরাধ নয়। যদিও এ সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিদিনের ভয়, লজ্জা ও শঙ্কার সঙ্গে লড়াই করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের অস্বীকৃতি। রাষ্ট্রের আইনও যখন সমকামীদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে; তখন মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার চিত্রটা দুর্বিষহ।

ভিন্ন যৌন পরিচয়কে পশ্চিমা সংস্কৃতি হিসেবে অবদমনের মুখোমুখি করে এ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা। যেখানে নিয়ন্ত্রণ একটি অস্ত্র। শারীরিক ও মৌখিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাপিত জীবনের যে সরল রৈখিক চিত্র উঠে আসে, সেখানে অধিকারের প্রশ্ন, ন্যায়বিচার ও স্বীকৃতি একটি অন্যায় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

ধর্মের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশে প্রাইড ইভেন্টগুলোর বেশি বেশি আয়োজন করতে হবে। অধিকারকর্মীদের এ বিষয়ে আরও উদ্যোগী হতে হবে। হুমকি ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বৈষম্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে মৌলবাদ ও ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে।

বাংলাদেশের আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে প্রতিনিয়ত ধর্মের আলেমদের শিশু বলাৎকারের ঘটনা জানান দেয়; যৌন বৈচিত্র্য, সমকামিতা কোনো অপরাধ নয়। ধর্ম মানে এমন মানুষদের মধ্যেও সমলিঙ্গীয় আকর্ষণ বেশ প্রবলভাবেই আছে। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো শিশুর সঙ্গে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নারী ও শিশু অধিকার আইন, ২০০০-এর লঙ্ঘন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক সমকামিতা অপরাধ নয়, এটি ভালোবাসা।

ভালোবাসা কখনো ধর্মের দেয়ালে অবরুদ্ধ হতে পারে না। মাদ্রাসা, মসজিদের যেসব মাওলানা, ধর্মের শিক্ষক শুধুমাত্র ধর্মের শেকলের কারণে সমকামিতায় লিপ্ত হতে, নিজের যৌনতা উপভোগে মানসিক সংকোচে ভুগছেন; তাদের এসব থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। যৌনতা ধর্মের বাধা বিষয় নয়। যৌনতা নিজের আত্মপরিচয় ও নিজস্ব আনন্দের।

বাংলাদেশে সমকামী সম্প্রদায় ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আলো আসবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *