ধর্মের নামে হত্যা, নাকি মানুষের বিবেকের মৃত্যু?

সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়—এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলার মতো একটি ঘটনা।

প্রথমেই একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার: কেউ ধর্মকে অপমান করেছে বলে অভিযোগ উঠলেই তাকে হত্যা করার অধিকার কারও জন্মায় না। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনো ন্যায়বিচার নয়; এটি সহিংসতা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

আমার কাছে মানুষের জীবনের মূল্য কোনো ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের চেয়ে বড়। একজন মানুষ আস্তিক, নাস্তিক, সংশয়বাদী কিংবা কোনো ধর্মের অনুসারী—যাই হোন না কেন, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায্য বিচারের অধিকার থাকা উচিত।

যদি ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা শেখানোর কথা বলে, তাহলে ধর্মের নাম ব্যবহার করে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার মানসিকতা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

কেউ কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে পারেন। সেই সমালোচনা কারও কাছে অস্বস্তিকর, কষ্টদায়ক কিংবা আপত্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু কোনো বক্তব্যের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া আর সেই বক্তব্যের জন্য কাউকে হত্যা করা এক বিষয় নয়। মতের বিরোধিতা করা যায়, প্রতিবাদ করা যায়, প্রয়োজনে আইনি অভিযোগও করা যায়—কিন্তু কাউকে গণপিটুনিতে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।

একটি সভ্য সমাজে অভিযোগের বিচার করবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালত, উত্তেজিত জনতা নয়।

নাস্তিক হওয়া মানে ধর্মবিশ্বাসী মানুষের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা নয়। আমি কোনো ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাসের কারণে তাঁকে ছোট করতে চাই না। একইভাবে, আমার অবিশ্বাসের কারণে কেউ যেন আমাকে শত্রু মনে না করেন—এটাই আমার প্রত্যাশা। বিশ্বাস করার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রশ্ন করার, দ্বিমত পোষণ করার এবং বিশ্বাস না করার স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোনো সমাজে ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়াকে সমর্থন করা হয়, তাহলে সেখানে শুধু সংখ্যালঘু বা নাস্তিকরাই অনিরাপদ নন; শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে। কারণ আজ যে জনতা অন্যের মতের কারণে তাকে শাস্তি দিচ্ছে, কাল সেই একই জনতা অন্য কোনো মতের কারণে আপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

আমাদের মনে রাখা উচিত, ধর্ম নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, বিশ্বাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না।

এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। দায়ীদের পরিচয় বা বিশ্বাস যা-ই হোক, প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গুজব, উসকানি ও যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে যেন আর কোনো নিরপরাধ মানুষ বিপদের মুখে না পড়েন, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন হতে হবে।

আমি ধর্মবিশ্বাসীদের শত্রু মনে করি না। আমি শত্রু মনে করি সেই মানসিকতাকে, যা নিজের বিশ্বাসকে অন্য মানুষের জীবনের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। আমি বিরোধিতা করি সেই ব্যবস্থার, যেখানে যুক্তির পরিবর্তে হুমকি, আলোচনার পরিবর্তে সহিংসতা এবং বিচারের পরিবর্তে জনতার উন্মত্ততা জায়গা করে নেয়।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—আমি একজন মানুষ, আর অপরজনও একজন মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *